আজকাল চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) বা এআই-এর নাম শোনেননি এমন মানুষ কমই আছেন। কিন্তু এই প্রযুক্তি আসলে কী? এটি কি আমাদের চাকরি কেড়ে নেবে, নাকি আমাদের জীবনকে আরও সহজ করবে? পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির হোয়ার্টন স্কুলের অধ্যাপক ইথান মলিক তাঁর “Co-Intelligence: Living and Working with AI” বইয়ে চমৎকারভাবে এই বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।
সাধারণ মানুষের জন্য এই বইটির মূল ধারণাগুলো নিয়ে আমাদের আজকের এই ব্লগ।
AI কোনো সাধারণ সফটওয়্যার নয় মলিকের মতে, এআই কোনো সাধারণ ক্যালকুলেটর বা এক্সেল শিটের মতো সফটওয়্যার নয়, এটি অনেকটা “ভিনগ্রহের বুদ্ধিমত্তার” (alien mind) মতো আচরণ করে। সাধারণ সফটওয়্যার নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের মধ্যে থেকে কাজ করে, কিন্তু লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLMs) বা এআই মানুষের মতো শেখে, লেখে এবং মাঝে মাঝে মানুষের মতোই ভুল করে। এটি মূলত আগের শব্দের পর কোন শব্দ বসবে, তা গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে অনুমান করে কাজ করে।
এআই-এর সাথে কাজ করার ৪টি সুবর্ণ নিয়ম ভবিষ্যতে টিকে থাকতে হলে এআই-এর সাথে কাজ করার কৌশল শিখতেই হবে। লেখক এ বিষয়ে ৪টি নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন:
১. এআই-কে সবসময় আপনার কাজে আমন্ত্রণ জানান (Always invite AI to the table): আপনি যাই করুন না কেন, এআই সেখানে কীভাবে সাহায্য করতে পারে তা পরীক্ষা করে দেখুন। এতে আপনি বুঝতে পারবেন কোন কাজে এআই পারদর্শী আর কোন কাজে নয়।
২. মানুষ হিসেবে নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতেই রাখুন (Be the human in the loop): এআই প্রায়শই খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে ভুল বা সম্পূর্ণ কাল্পনিক তথ্য (hallucinations) দিয়ে থাকে। তাই অন্ধভাবে এআই-কে বিশ্বাস না করে, নিজের বিচার-বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে এর ভুলগুলো সংশোধন করা জরুরি
৩. এআই-এর সাথে মানুষের মতো আচরণ করুন (Treat AI like a person): এআই-কে নির্দেশ দেওয়ার সময় নির্দিষ্ট কোনো মানুষের মতো কাজ করতে বলুন। যেমন, আপনি যদি বলেন “একজন দক্ষ মার্কেটার হিসেবে এই পণ্যের জন্য একটি স্লোগান লিখে দাও”, তবে এটি আরও ভালো ও সৃজনশীল ফলাফল দেবে।
৪. ধরে নিন এটি আপনার দেখা সবচেয়ে খারাপ এআই (Assume this is the worst AI you will ever use): এআই প্রযুক্তি অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে উন্নত হচ্ছে। আজ আপনি যে এআই ব্যবহার করছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই তা আরও বহুগুণ শক্তিশালী হবে। তাই ভবিষ্যতের পরিবর্তনের জন্য মানসিক প্রস্তুতি রাখুন।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে AI-এর প্রভাব
- কর্মক্ষেত্রে এআই (AI as a Coworker): এআই আমাদের চাকরি পুরোপুরি কেড়ে নেবে না, তবে কাজের ধরন বদলে দেবে। লেখক এআই-এর সাথে কাজ করার দুটি উপায়ের কথা বলেছেন— ‘সেন্টর’ (Centaur) এবং ‘সাইবর্গ’ (Cyborg)। এর মানে হলো এআই-এর সাথে কাজ ভাগাভাগি করে নেওয়া। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিরক্তিকর ও একঘেয়ে কাজগুলো এআই-কে দিয়ে আমরা আরও গুরুত্বপূর্ণ ও সৃজনশীল কাজে মন দিতে পারি। এটি দুর্বল কর্মীদের দক্ষতা বাড়িয়ে সবাইকে সমান কাতারে নিয়ে আসতে সাহায্য করবে।
- শিক্ষাক্ষেত্রে এআই (AI as a Tutor): এআই-এর কারণে প্রথাগত হোমওয়ার্ক বা বাড়ির কাজের ধারণা বদলে যাচ্ছে, কারণ এআই খুব সহজেই যেকোনো প্রশ্নের উত্তর বা প্রবন্ধ লিখে দিতে পারে। কিন্তু এর একটি দারুণ ইতিবাচক দিকও আছে। এআই বিশ্বের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একজন অসাধারণ ব্যক্তিগত গৃহশিক্ষক বা কোচ হিসেবে কাজ করতে পারে, যা শিক্ষার্থীদের শেখার মান অনেক উন্নত করবে এবং পড়াশোনাকে আনন্দদায়ক করে তুলবে।
শেষ কথা পরিশেষে, ইথান মলিক আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে এআই নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এটি সম্পূর্ণ নিজস্ব কোনো মন বা সত্ত্বা নয়, বরং এটি আমাদের ‘সহ-বুদ্ধিমত্তা’ বা কো-ইন্টেলিজেন্স। এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং তথ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এটি আমাদের ধ্বংস করবে নাকি সমাজকে আরও উন্নত করবে, সেই সিদ্ধান্ত এবং নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত আমাদের মানুষের হাতেই রয়েছে।
তাই এআই-কে ভয় না পেয়ে, একে নিজের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গী বানিয়ে নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ!

